যেসব শিশুর নিদ্রাহীনতা আছে তারাই অবসাদে আক্রান্ত হয় বেশি

0
336

child-selpingকিশোর বয়সে জন তীব্র উদ্বেগ, অবসাদ ও আত্মহত্যা প্রবণতার সঙ্গে লড়াই করেছে। আর প্রতিরাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা করে ঘুমানো সত্ত্বেও সে সকালে ঠিক সময়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠতে পারত না।

নিউ ইয়র্কের পুরুষ মিলার প্লেস এর বড় ধরনের অবসাদজনিত এবং উদ্বেগজনিত মানসিক বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা করানো হয়। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এবং বাইরে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া অসংখ্য ওষুধ খেয়েছেন। কিন্তু কিছুই তাকে সুস্থ করতে পারেনি।

জনও বাজারে যত ওষুধ পাওয়া যায় তার সবগুলো ব্যাবহার করেছেন কিন্তু কোনো সুফল পাননি।

তবে নিউ ইয়র্কের স্মিথটাউনের স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ ডিজঅর্ডারস সেন্টারের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসা পরিচালক ড. আব্রাম আর গোল্ড এর চিকিৎসায় ভালো হন জন।

ড. আব্রাম আর গোল্ড জনের নিদ্রাহীনতার চিকিৎসা করেন। এবং একটি ক্ষুধাবর্ধক স্থাপন করে দেন। সুস্থ হওয়ার পর জনের ঘুমের উন্নতি হয়। তার দেহের শক্তিও বেড়ে যায়। এমনকি জনের ওজনও কমে আসে ৪০ পাউন্ড।

এরপর থেকে জন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা করে ঘুমাতে পারেন অনায়াসে। এবং খুবই বিশ্রাম অনুভব করেন। তার মানসিক অবসাদও দূর হয়ে গেছে। এবং তার আর কোনো ইসিটি চিকিৎসাও দরকার হচ্ছে না।

অবসাদ ও নিদ্রাহীনতার সংযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের হিসেব মতে ২ থেকে ৩ শতাংশ শিশুই নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয় এবং এদের ১০ থেকে ২০ শতাংশ আবার নাক ডাকে।
যে শিশুদের ওজন বেশি তারা আবার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, ডাউন সিনড্রোম বা অন্যান্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়। এদের বেশির ভাগেরই নিদ্রাহীনতার সমস্যা দেখা দেয়।

জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসমূহের হিসেব মতে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের ১১ শতাংশেরই বড় ধরনের অবসাদজনিত মানসিক বিশৃঙ্খলা আছে। ২১০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩০ লাখ শিশু বড় ধরনের অবসাদে আক্রান্ত ছিল।

অবসাদের ফলে শিশুদের মাদকদ্রব্য ব্যবহার এবং আত্মহত্যা প্রবণতার ঝুঁকি তৈরি হয়। আর এটি ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এর গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল স্লিপ মেডিসিন এর এক মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত যে শিশুদের নিদ্রাহীনতার সমস্যা আছে তাদের অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

তবে অবসাদের সঙ্গে নিদ্রাহীনতার সংযোগের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নিদ্রাহীনতার কারণে অবসাদ সৃষ্টি হয় এমন ধারণার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ আছে।

নিদ্রাহীনতার কারণে শিশুর ঘুমের গুণগত মান নষ্ট হয়। যার ফলে তার ব্যবহার, মনোযোগ, স্মৃতি এবং মেজাজ-মর্জির বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অক্সিজেনের নিম্ন মাত্রা হরমোন এবং মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। যা থেকে মানসিক অবসাদেরও সৃষ্টি হতে পারে।

নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত শিশুদের অনেকে আবার স্থূলতায় ভোগে। আর স্থূলতা মানসিক অবসাদের সৃষ্টি করে।

জার্নাল স্লিপে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নাক-ডাকা এবং ঘুমের বিশৃঙ্খলাজনিত শ্বাস কষ্টে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মানসিক অবসাদের লক্ষণ বেশি। তারা স্থূলতায় আক্রান্ত হলো কি হলো না তাতেও এর কোনো হেরফের হয় না।

নিদ্রাহীনতার সঙ্গে সেরোটোনিন হরমোনের নিম্নমাত্রার যোগসাজশও রয়েছে। আর সেরোটোনিন অবসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

এ ছাড়া নিদ্রাহীনতা লেপটিন প্রতিরোধ করে। এই হরমোনটি হলো ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন। যার ফলে ওজন বেড়ে যাওয়া এবং স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। আর স্থূলতায় আক্রান্ত একজন কিশোরের সহজেই নিম্ন আত্মবিশ্বাস এবং অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

লক্ষণগুলো কী
আচরণে লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা দেবে। যেমন বিরক্তি, ছোট শিশুদের দেখে কান্না, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম ঘুমানো এবং ক্ষুধামান্দ্য এর সবগুলোই লাল পতাকা লক্ষণ। কিছু শিশু নিজেকে গুটিয়ে নিলেও অনেকে আবার বেশি তৎপর হয়ে ওঠে।
বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেনি এমন শিশুরা হয়তো বলবেনা যে, আমি দুঃখবোধে আক্রান্ত হয়েছি।

নাকডাকা, শ্বাসগ্রহণে কষ্ট, মুখ খুলে বাতাস গ্রহণ, জোরে শ্বাস নেওয়া এবং অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব এর সবগুলোই নিদ্রাহীনতার লক্ষণ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিদ্রাহীনতা, এডিএইচডি এবং ক্লান্তির লক্ষণগুলো শুধু অবসাদ নং বরং নিদ্রাহীনতার ফলেও দেখা দিতে পারে।

কোনো শিশু যদি নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয় তাহলে তার চিকিৎসা না করালেও হয়ত চলবে। কিন্তু কোনো শিশু যদি নিদ্রাহীনতা এবং অবসাদ দুটোতেই আক্রান্ত হয় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে তার চিকিৎসা করাতে হবে।

LEAVE A REPLY