নৈতিকতা,ধর্ম ও জীবন

0
620
নৈতিকতা,ধর্ম ও জীবন

সচ্চরিত্রবান মানুষের সান্নিধ্য নিশ্চয়ই পেয়েছেন আপনারা। যারা তাদের চরিত্রের সৌন্দর্য দিয়ে, তাদের আচার আচরণ দিয়ে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারাই সচ্চরিত্রবান। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী মানুষেরা ভদ্র, নম্র, বিনয়ী এবং প্রীতিময় হয়ে থাকেন। বহু বর্ণনায় এসেছে চারিত্রিক সততা ও সৌন্দর্য কিয়ামতের দিনের জন্যে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যার এই সৎ গুণটি থাকবে সে বহুরকম সহযোগিতা পাবে, বহুভাবে তাকে সাহায্য করা হবে। সচ্চরিত্রের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রেও মানুষ অন্যদের ওপর বেশ ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নৈতিকতার গুণে সমৃদ্ধ ব্যক্তি নিজের সমস্যার পাশাপাশি অন্যদের সমস্যাও সমাধান করার সামর্থ রাখে।

এদিক থেকে বলা যায় সুন্দর চরিত্র ও নৈতিকতা মানবজীবনে উৎসাহ উদ্দীপনা এবং উদ্যমী শক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড়ো রকমের উৎস। পক্ষান্তরে রাগ, মেজাজ, উত্তেজনাপূর্ণ ব্যবহার মানুষের দেহ মনে বহু রোগব্যাধির জন্ম দেয় এবং নেতিবাচক শক্তি লালন করতে সাহায্য করে।  মন্দ ব্যবহার বা অসৎ চরিত্র মানুষের ভেতরে জন্ম দেয় বহু অসৎ চিন্তা এবং নেতিবাচক প্রভাব বলতে যা বোঝায় তার সবই প্রায় মানুষের চিন্তায় ফেলে। যার ফলে মানুষ চরম এবং কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়।

আমরা সমাজের দিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবো সচ্চরিত্রের অধিকারী এবং নৈতিক গুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তি নিজের জীবনে এবং সমাজের সাথে তাঁর যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সফল। জীবন যাপনেও তিনি অন্যদের তুলনায় সুস্থতর এবং পরিশীলিত। সমাজে তিনি অনেকের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং সকলের কাছে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। মানুষ এ ধরনের নৈতিকতা গুণ সম্পন্ন ব্যক্তির ওপর গভীর আস্থা এবং বিশ্বাস রাখে। এ ধরনের বিশ্বস্ত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সাহচর্য লাভ করতে পেরে সবাই নিজেকে ধন্য মনে করে। নৈতিক সৎ গুণাবলি, ইতিবাচক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদেরকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা সম্মান করার মধ্য দিয়েই এই আনন্দ, এই ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা সম্মান অর্জিত হয়।

পক্ষান্তরে যারা নৈতিকতাহীন অসচ্চরিত্রের অধিকারী, তারা সবসময়ই জনবিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, কোনঠাসা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, অসুস্থ এবং অধিকতর ভঙ্গুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে থাকে। এ ধরনের মানুষের জীবনে দুঃখ বেদনা, হতাশা আর বিচিত্র কষ্ট ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। হযরত আলী (আ) বলেছেন, ‘অনৈতিকতা জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে এবং আত্মদহন ও  ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়’।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রেরিত সকল নবী রাসূলকে ভদ্র নম্র সচ্চরিত্রের গুণাবলি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন যাতে জনগণের মাঝে নিজেদের মর্যাদাবান, বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ এবং একমাত্র দ্বীন হিসেবে এই দ্বীনের অনুসারীদেরকে তাই নবী রাসূলের সেই চারিত্রিক গুণাবলি সম্পন্ন হবার প্রতি উৎসাহিত করেছে এবং নৈতিক অসৎ গুণাবলি থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছে। স্বয়ং আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ছিলেন উন্নত নৈতিক চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ। পবিত্র কুরআনে এসেছে: ‘নিঃসন্দেহে তুমি নৈতিকতার অতি উচ্চ মর্যাদার সমাসীন’।

নবী (সা) এর উত্তম চরিত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে একরকম অনুগ্রহ। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে-ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘(হে নবী!) এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে,তোমার ব্যবহার তাদের প্রতি বড়ই কোমল৷ নয়তো যদি তুমি রুক্ষ স্বভাবের বা কঠোর চিত্ত হতে,তাহলে তারা সবাই তোমার চার পাশ থেকে সরে যেতো’।

ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যে রাসূলে খোদার শত্রুরা নবীজীকে নিপীড়ন করার জন্যে তাঁর কাছে এসেছিল, কিন্তু নবীজীর মন কেড়ে নেওয়া আচরণে মুগ্ধ হয়ে রাসূলকে অপমান করা তো দূরে থাক উল্টো বরং সমূহ আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। নবী করিম (সা) বলেছিলেন: ‘সদাচরণ ও চারিত্রিক সততা দ্বীনের অর্ধেক’।

ইসলামের ইতিহাসের পাতায় সাদ বিন মোয়াজের নামটি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। তিনি ছিলেন মদিনার উস গোত্রের প্রধান। রাসূলের ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন হিসেবে তাঁকে পরিগণিত করা হয়। বদর, ওহুদ এবং খন্দক যুদ্ধে তিনি নবীজীর সঙ্গে ছিলেন। পঞ্চম হিজরিতে সাদ বিন মোয়াজের আহত বাহু থেকে ব্যাপকভাবে রক্তপাত হচ্ছিলো। খন্দকের যুদ্ধের পরের ঘটনা এটি। নবীজী একথা জানতে পেরে তাকে দেখতে গেলেন। তাকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করলেন এভাবে: ‘হে খোদা! সাদ তোমার পথে জিহাদ করেছে। তোমার নবীকে সত্য বলে গ্রহণ করেছে। তার রুহকে তুমি ভালোভাবে গ্রহণ করো’! তীরের আঘাতে আহত মোয়াজ শেষ পর্যন্ত ৭৩ বছর বয়সে শাহাদাতবরণ করেন।

রাসূল (সা) কে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানোর পর নবীজী তাঁর সাহাবিদের নিয়ে জানাযাকে গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে কফিনে ঢুকিয়ে রওনা হলেন দাফনের জন্যে। কবরের কাছে পৌঁছে নবীজী নিজেই কবরের ভেতর নেমে লাশ কবরে শুইয়ে দিলেন। তারপর তাঁর নিজের পবিত্র হাতে মোয়াজের কবরে মাটি দিলেন। সাদের মা কবরের পাশে এসে বললেন: আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসী করুন! নবীজী বললেন: হে সাদের মা! একটু চুপ করুন! সাদ এখন কবরের চাপের কষ্টের মধ্যে আছে।

কবর থেকে ফিরে আসার পর রাসূলের এক সাহাবি জানতে চাইলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার নিজ পবিত্র হাতে সাদকে কবর দিলেন, অথচ বলছেন সাদ কবরের চাপ ভোগ করছে!?

নবীজী বললেন: হ্যাঁ! বাসার ভেতরে সাদের আচরণ শোভন ছিল না, কবরের চাপের কারণ সেটাই।

LEAVE A REPLY